ফাউন্ডার্স অ্যান্ড হিরোস

ফজলে হাসান আবেদ: যিনি এনজিওকেও শেখালেন কর্পোরেট শৃঙ্খলা

একজন কর্পোরেট এক্সিকিউটিভের ঝুঁকি নেওয়ার গল্প

ফজলে হাসান আবেদকে শুধু একজন সমাজকর্মী হিসেবে দেখলে তাঁর আসল অর্জনটাই আড়ালে থেকে যায়। ১৯৩৬ সালে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে জন্ম নেওয়া আবেদ গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে হিসাববিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করেন এবং শেল অয়েল কোম্পানির মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। অর্থাৎ, ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার আগেই তাঁর হাতে ছিল কর্পোরেট ফাইন্যান্স ও অপারেশন্স ম্যানেজমেন্টের বাস্তব অভিজ্ঞতা — যা পরবর্তীতে তাঁর প্রতিষ্ঠানকে অন্য দশটা এনজিও থেকে আলাদা করে তোলে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর ক্যারিয়ারের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেয়। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে তিনি লন্ডনে থাকা নিজের ফ্ল্যাট বিক্রি করে দেন — এটাই ছিল তাঁর প্রথম “স্টার্টআপ ক্যাপিটাল”। ১৯৭২ সালে, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে, সেই পুঁজি দিয়েই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্র্যাক (BRAC)।

প্রোডাক্ট-মার্কেট ফিট: ত্রাণ থেকে টেকসই মডেলে রূপান্তর

ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে আবেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি ছিল এটি: তিনি বুঝেছিলেন, শুধু ত্রাণ বিতরণ কোনো টেকসই সমাধান নয়। দাতব্য মডেল থেকে সরে এসে তিনি এমন একটি কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্রঋণ ও কর্মসংস্থান — এই চারটি স্তম্ভ একসঙ্গে কাজ করে একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর করে তোলে। এটি ছিল এক ধরনের “ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন” — যেখানে একই প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের (এক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর) প্রতিটি প্রয়োজন নিজেই পূরণ করে, বাইরের নির্ভরতা কমিয়ে আনে।

রেভিনিউ মডেল: এনজিও যখন নিজের আয়ে চলে

আবেদের সবচেয়ে বিপ্লবী উদ্ভাবন ছিল “সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ” ধারণার বাস্তবায়ন। প্রচলিত এনজিওগুলো যখন সম্পূর্ণভাবে বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল, তখন তিনি ব্র্যাকের অধীনে একের পর এক আয়বর্ধক ব্যবসায়িক ইউনিট দাঁড় করান — ডেইরি, পোলট্রি, হস্তশিল্প, বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্যাংকিং পর্যন্ত। ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং আফতাব বহুমুখী ফার্মস, আড়ং-এর মতো ব্র্যান্ড গড়ে তোলা ছিল এই কৌশলেরই অংশ। ফলাফল: আজ ব্র্যাকের আয়ের একটি বড় অংশ আসে নিজস্ব বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে, দাতাদের অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সংস্থাটি আর্থিকভাবে অনেকটাই স্বনির্ভর।

স্কেলিং কৌশল: ঝুঁকি যেখানে প্রতিযোগীরা পিছু হটে

একটি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ও টেকসইভাবে বড় করার জন্য যে সাহসী সিদ্ধান্তের দরকার হয়, আবেদ তার একাধিক উদাহরণ রেখে গেছেন। ২০০২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে যখন বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পিছপা হচ্ছিল, তখন ব্র্যাক এগিয়ে আসে। এই প্রথম-মুভার সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ব্র্যাককে একটি আঞ্চলিক এনজিও থেকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে — বর্তমানে যার কার্যক্রম এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক দেশে বিস্তৃত।

প্রতিষ্ঠান গঠন ও লিডারশিপ পাইপলাইন

আবেদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক শিক্ষা হলো প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল না রেখে সিস্টেম-নির্ভর করে তোলা। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, যা শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং সংস্থার জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির একটি পাইপলাইনও বটে। ফলে তাঁর মৃত্যুর পরও (২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর) ব্র্যাকের কার্যক্রমে কোনো বড় বিচ্যুতি ঘটেনি — যা একজন প্রতিষ্ঠাতার সবচেয়ে বড় সাফল্যের সংজ্ঞা হতে পারে: এমন একটি প্রতিষ্ঠান রেখে যাওয়া, যা তাঁকে ছাড়াও এগিয়ে চলতে পারে।

সংখ্যায় ব্র্যাক

  • প্রতিষ্ঠা: ১৯৭২ সাল, প্রাথমিক পুঁজি ব্যক্তিগত সম্পদ (লন্ডনের ফ্ল্যাট বিক্রির অর্থ)
  • বর্তমান কর্মীসংখ্যা: বাংলাদেশেই এক লক্ষের বেশি
  • ব্যবসায়িক ইউনিট: ব্র্যাক ব্যাংক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক সামাজিক ব্যবসা
  • ভৌগোলিক বিস্তৃতি: এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক দেশ
  • মডেল ফলোয়ার: বিশ্বের বহু দেশ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্র্যাকের কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করছে

উদ্যোক্তাদের জন্য শিক্ষা

আবেদের গল্প থেকে বাংলাদেশের যেকোনো উদ্যোক্তার শেখার আছে তিনটি বিষয়: এক, নিজের সঞ্চয় ঝুঁকিতে ফেলার সাহস ছাড়া বড় কিছু গড়া যায় না। দুই, টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে একক আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী রেভিনিউ স্ট্রিম তৈরি করতে হয়। তিন, প্রতিষ্ঠাতার অনুপস্থিতিতেও যেন প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে, সেই কাঠামো আগে থেকেই তৈরি করে রাখতে হয়। এই তিনটি নীতিই আজ ব্র্যাককে পরিণত করেছে বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়, যার মডেল অধ্যয়ন করা হয় হার্ভার্ডসহ বিশ্বের সেরা বিজনেস স্কুলগুলোতে।

তাঁর প্রাপ্ত সম্মাননার তালিকাও দীর্ঘ — রামোন ম্যাগসেসে পুরস্কার, স্প্যানিশ অর্ডার অব সিভিল মেরিট, লিও তলস্তয় আন্তর্জাতিক স্বর্ণ পদক, মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার, এবং ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের নাইট উপাধি — যা থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় “স্যার” শব্দটি।


ট্যাগ: প্রতিষ্ঠাতা, সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ, স্কেলিং, লিডারশিপ, ব্র্যাক

btimes desk