বিজনেস অ্যানালিসিস

সোশ্যাল মিডিয়া : যেভাবে বদলে যাচ্ছে অনলাইন কেনাকাটা

Social Commerce: How Social Media Is Changing Online Shopping | BTimes
Social commerce is changing how consumers discover, evaluate and buy products. Explore how social media, creators and live shopping are reshaping e-commerce.

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর শুধু যোগাযোগ বা বিনোদনের জায়গা নয়। পণ্য আবিষ্কার, যাচাই থেকে কেনাকাটা—পুরো প্রক্রিয়াই ক্রমে চলে আসছে একই প্ল্যাটফর্মে। এতে বদলে যাচ্ছে ভোক্তার আচরণ এবং ব্যবসার প্রচলিত কৌশল।

একসময় অনলাইনে কোনো পণ্য কিনতে হলে সার্চ ইঞ্জিনে গিয়ে খুঁজতে হতো। এরপর বিভিন্ন ওয়েবসাইটে গিয়ে দাম, বৈশিষ্ট্য ও গ্রাহকের মতামত তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হতো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই অভ্যাসে নতুন পরিবর্তন আনছে।

এখন একজন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও দেখতে গিয়ে কোনো পণ্য আবিষ্কার করছেন, সেটির ব্যবহার দেখছেন, অন্যদের মতামত পড়ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে একই প্ল্যাটফর্ম থেকেই কেনাকাটা করছেন।

অর্থাৎ কেনাকাটার পথ হয়ে উঠছে—

দেখা → আগ্রহ → যাচাই → কেনা

এই পরিবর্তনকেই বলা হচ্ছে সোশ্যাল কমার্স বা সামাজিক বাণিজ্য

পণ্য খোঁজার জায়গা থেকে কেনার জায়গা

এনআইকিউ-এর ২০২৬ সালের বৈশ্বিক গবেষণা অনুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রায় ৫৯ শতাংশ ভোক্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পণ্য কেনেন। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে এই প্রবণতা এখনও তুলনামূলকভাবে কম হলেও, সেখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোক্তা সামাজিক মাধ্যমে পণ্য আবিষ্কার করার পর তা কিনছেন।

অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু বিজ্ঞাপনের জায়গা হিসেবে থাকছে না; এটি ধীরে ধীরে পণ্য আবিষ্কার, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কেনাকাটার একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল হয়ে উঠছে।

এনআইকিউ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি প্রচলিত ই-কমার্সের তুলনায় দ্রুত হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ৬২.৯ শতাংশ এবং দ্রুত সরবরাহভিত্তিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ৬২.২ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এত গুরুত্বপূর্ণ?

এর বড় কারণ হলো কনটেন্ট

একটি প্রচলিত বিজ্ঞাপন কোনো পণ্যের কথা বলে। কিন্তু একটি ছোট ভিডিও পণ্যটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটি দেখাতে পারে। একজন কনটেন্ট নির্মাতা নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন। আবার সরাসরি সম্প্রচারে একজন বিক্রেতা একই সঙ্গে পণ্য দেখানো ও ক্রেতার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন।

ফলে বিনোদন এবং কেনাকাটার মধ্যে দূরত্ব কমে যাচ্ছে।

এনআইকিউ-এর গবেষণায় দেখা যায়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামাজিক ও সরাসরি সম্প্রচারভিত্তিক বাণিজ্য ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

শপিং মলের মতোই, তবে আরও ব্যক্তিগত

একটি শপিং মলে ক্রেতা বিভিন্ন দোকানে ঘুরে পণ্য দেখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ধারণাটি আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে।

একজন ব্যবহারকারী কী দেখছেন, কীতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন বা কোন ধরনের কনটেন্টের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন—এসব সংকেতের ভিত্তিতে প্ল্যাটফর্ম তার সামনে নতুন পণ্য ও ব্র্যান্ড তুলে ধরতে পারে।

ফলে প্রচলিত ই-কমার্সে যেখানে মানুষ পণ্য খোঁজেন, সামাজিক বাণিজ্যে অনেক সময় পণ্যই মানুষের সামনে এসে হাজির হয়

এটি অনলাইন কেনাকাটার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নতুন প্রতিযোগিতা

সামাজিক বাণিজ্যের উত্থান ব্র্যান্ডগুলোর বিপণন কৌশলও বদলে দিতে পারে।

আগে ব্র্যান্ডের লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছানো। এখন শুধু বিজ্ঞাপন যথেষ্ট নাও হতে পারে। কোন কনটেন্ট মানুষের নজর কাড়ছে, কোন কনটেন্ট নির্মাতা মানুষের আস্থা অর্জন করছেন এবং কোন গল্প পণ্যকে আকর্ষণীয় করে তুলছে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এনআইকিউ-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমা বাজারে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোক্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পণ্য আবিষ্কার করার পর সেটি কিনেছেন।

অর্থাৎ ব্র্যান্ডের জন্য নতুন প্রশ্ন হতে পারে—

“আমাদের বিজ্ঞাপন কতজন দেখল?”

এর পাশাপাশি—

“আমাদের পণ্য নিয়ে কতজন কথা বলল এবং কতজন সেটি দেখে কিনল?”

শুধু বিক্রি নয়, পুরো ব্যবসায়িক ব্যবস্থাই বদলাচ্ছে

প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্সের (PwC) ২০২৬ সালের রিটেইল মনিটর বলছে, সামাজিক বাণিজ্য এখন শুধু বিপণনের বিষয় নয়; এটি গ্রাহকের যাত্রা, পণ্য সরবরাহ, তথ্য, প্রযুক্তি ও ব্যবসার নিয়মনীতি—পুরো খুচরা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

এখানে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাস।

দীর্ঘ ডেলিভারি সময়, ভুল পণ্য বা প্রত্যাশার সঙ্গে না মেলা পণ্য সামাজিক মাধ্যমে কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্য বিক্রি করলেই হবে না—তথ্য, মূল্য, পেমেন্ট ও সরবরাহব্যবস্থাও নির্ভরযোগ্য হতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করে?

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা ও অনলাইন বিক্রি ইতোমধ্যে অনেক ছোট উদ্যোক্তার গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয়মাধ্যম।

সামাজিক বাণিজ্যের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি তাই বাংলাদেশের ছোট ব্যবসার জন্যও বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

একজন উদ্যোক্তার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একই সঙ্গে হতে পারে—

দোকান + প্রদর্শনী + প্রচারণা + গ্রাহকের মতামতের জায়গা।

ভবিষ্যতে একজন ক্রেতাকে হয়তো আলাদা করে কোনো ওয়েবসাইটে গিয়ে পণ্য খুঁজতে হবে না। একটি ভিডিও দেখার সময়ই পণ্যটি সামনে আসতে পারে, সেটির তথ্য জানা যেতে পারে এবং সেখান থেকেই কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

বড় পরিবর্তনটি কোথায়?

সামাজিক বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো কেনাকাটা আর আলাদা কোনো কাজ হিসেবে থাকছে না।

মানুষ বিনোদন নিতে গিয়ে পণ্য দেখছে। পণ্য দেখতে গিয়ে তার ব্যবহার সম্পর্কে জানছে। অন্যের অভিজ্ঞতা দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সেখানেই কিনছে।

এনআইকিউ-এর ভাষায়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্রমে আলাদা আলাদা চ্যানেলের পরিবর্তে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে—যেখানে পণ্য আবিষ্কার, লেনদেন ও সরবরাহ একই যাত্রার অংশ।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ শুধু কী দেখবে, তা ঠিক করছে।

আগামী দিনে হয়তো কী কিনবে, সেটিও অনেকাংশে সেখানেই ঠিক করবে।


বিটাইমস বিশ্লেষণ | ট্রেন্ডস

সূত্র: এনআইকিউ (NIQ), প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্স (PwC)

বিটাইমস বিশ্লেষণ