বাংলাদেশে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডির গাড়ি স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের পথে এগিয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলস পিএলসি। দুই ও তিন চাকার যানবাহনের ব্যবসার বাইরে গিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে প্রবেশের এই উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কৌশলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে বিওয়াইডির সঙ্গে একটি কারিগরি চুক্তি সম্পন্ন করেছে রানার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিওয়াইডির বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের জন্য কারখানা সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগের পথ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি রানার অটোমোবাইলসের ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে দ্য ডেইলি স্টার।
স্থানীয় উৎপাদন শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে বিওয়াইডির গাড়ি আমদানি ও বিপণন অব্যাহত রাখবে রানার। অর্থাৎ, আমদানিনির্ভর ব্যবসা থেকে ধীরে ধীরে স্থানীয় উৎপাদনের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়ানোর সময়েই নতুন বিনিয়োগ
বিওয়াইডির সঙ্গে এই উদ্যোগ এমন সময়ে এসেছে, যখন কয়েক বছর ধরে দুর্বল অবস্থার পর রানার অটোমোবাইলসের আর্থিক পরিস্থিতিতে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির একক রাজস্ব ২৮ শতাংশ বেড়ে ৫৬৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে পরিচালন মুনাফা বেড়ে হয়েছে ১১০ কোটি টাকা।
লোকসান থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রানারের নিট লোকসান ছিল ৭০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পরিবর্তিত হয়ে ৭ কোটি টাকা নিট মুনাফায় এসেছে।
তবে ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক ব্যয়ের চাপ এখনো প্রতিষ্ঠানটির আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবসা রানারের জন্য যেমন নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি কারখানা সম্প্রসারণ ও যন্ত্রপাতিতে বড় বিনিয়োগ আর্থিক চাপও বাড়াতে পারে।
২৫০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা
বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে বিনিয়োগের পাশাপাশি অর্থায়নের পথও তৈরি করছে রানার।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২৫০ কোটি টাকা মূল্যের অগ্রাধিকার শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছে। এর অন্তত অর্ধেক অর্থ পরবর্তী সময়ে সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত মূলধন ২০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০০ কোটি টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন।
সম্ভাব্যতা যাচাই থেকে উৎপাদনের পথে
রানার ও বিওয়াইডির সহযোগিতার বিষয়টি প্রথম সামনে আসে ২০২৬ সালের মার্চে। তখন দুই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিওয়াইডির গাড়ি উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য একটি সরবরাহ ও উৎপাদনসংক্রান্ত চুক্তিতে যায়।
সে সময় উৎপাদন কারখানা, বিনিয়োগের পরিমাণ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা জানানো হয়েছিল।
এখন কারিগরি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় সেই প্রাথমিক পর্যায় থেকে প্রকল্পটি আরও এক ধাপ এগিয়েছে। এ বিষয়ে আগের প্রতিবেদনটি দেখুন।
বাংলাদেশে বিওয়াইডির উৎপাদনভিত্তি
চীনের বিওয়াইডি ২০২৪ সালে আমদানির মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে প্রবেশ করে। রানারের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদন শুরু হলে বাংলাদেশে বিওয়াইডির একটি উৎপাদনভিত্তি তৈরি হবে।
এতে শুধু রানারের ব্যবসার পরিধিই বাড়বে না, বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে গাড়ি সংযোজন, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, কারিগরি দক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকল্পটির প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে বিনিয়োগের পরিমাণ, উৎপাদন সক্ষমতা, উৎপাদন শুরুর সময় এবং স্থানীয়ভাবে কতটা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয়ের ওপর।
রানারের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
রানার অটোমোবাইলস দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের বাজারে পরিচিত প্রতিষ্ঠান। বিওয়াইডির সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদনে গেলে কোম্পানিটি দেশের যাত্রীবাহী বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ পাবে।
এর আগে রানার ও বিওয়াইডির সম্ভাব্য স্থানীয় উৎপাদন নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে যানবাহন উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন।
শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
সাম্প্রতিক ঘোষণার পর রানার অটোমোবাইলসের শেয়ারদরে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রোববার প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে ৫৩ টাকায় উঠেছে। এর ৫২ সপ্তাহের সর্বোচ্চ দর ৫৪ টাকা। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন।
তবে শেয়ারদরের এই তাৎক্ষণিক পরিবর্তন প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে রানার কতটা কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করতে পারে, উৎপাদন শুরু করতে পারে এবং বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারে তার ওপর।
আমদানি থেকে উৎপাদনে
বাংলাদেশে বিওয়াইডির যাত্রা শুরু হয়েছিল আমদানির মাধ্যমে। এখন রানারের কারখানায় স্থানীয় উৎপাদনের উদ্যোগ সেই ব্যবসাকে নতুন পর্যায়ে নিতে পারে।
একদিকে রানারের জন্য এটি নতুন ব্যবসার সুযোগ, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য এটি বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে স্থানীয় উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ।
প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দুই ও তিন চাকার যানবাহনের বাইরে রানার অটোমোবাইলসের জন্য এটি হতে পারে নতুন একটি বড় ব্যবসায়িক অধ্যায়ের সূচনা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারও পেতে পারে স্থানীয় উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ইংরেজি ভার্সন পড়ুন: Runner to Manufacture BYD Electric Cars in Bangladesh, Signalling Major EV Shift


