টপ কোম্পানিস

আবুল খায়ের গ্রুপ: ছোট ব্যবসা থেকে দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী

Abul Khair Group: How a Small Business Became a Major Industrial Group in
Discover how Abul Khair Group grew from a small business in 1953 into one of Bangladesh's major industrial groups across steel, cement, consumer goods, ceramics and more.

বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর নাম উঠলে আবুল খায়ের গ্রুপের নাম প্রায়ই সামনে আসে। ইস্পাত, সিমেন্ট, ভোগ্যপণ্য, সিরামিক, তামাকসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। কয়েক দশকের পথ পেরিয়ে আবুল খায়ের গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

শুরুটা হয়েছিল ছোট পরিসরে

আবুল খায়ের গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৩ সালে। প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়ের চট্টগ্রামে হাতে তৈরি বিড়ির ব্যবসার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন। এর আগে তিনি খুচরা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে তিনি নির্মাণসামগ্রী, ইটভাটা, তাঁত ও পণ্য আমদানির ব্যবসায় যুক্ত হন।

স্বাধীনতার পর ইস্পাতের পাত, সিমেন্ট, দুধ, নারিকেল তেলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ আজ যেসব পণ্য প্রতিষ্ঠানটি নিজেই উৎপাদন করে, সেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে তাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল আমদানি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে।

এখানেই আবুল খায়ের গ্রুপের ব্যবসায়িক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যায়—একটি পণ্যে আটকে না থেকে বাজারের নতুন সুযোগ খুঁজে ব্যবসার পরিধি বাড়ানো।

পারিবারিক ব্যবসা থেকে শিল্পগোষ্ঠী

প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়েরের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরিরা ব্যবসার দায়িত্ব নেন। প্রতিষ্ঠাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান আবুল কাসেম বর্তমানে গ্রুপটির চেয়ারম্যান। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বড় শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবসা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এই সময়ে ব্যবসার ধরনেও বড় পরিবর্তন আসে।শুধু পণ্য আমদানি ও বেচাকেনার পরিবর্তে নিজস্ব কারখানা, উৎপাদনব্যবস্থা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

ইস্পাত ব্যবসায় বড় অবস্থান

আবুল খায়ের গ্রুপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাগুলোর একটি ইস্পাত। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি পাতলা ইস্পাত উৎপাদনের ব্যবসায় প্রবেশ করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ধরনের ইস্পাত পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দস্তার প্রলেপযুক্ত ইস্পাতের পাত, ঠান্ডা প্রক্রিয়ায় তৈরি ইস্পাতের কুণ্ডলী এবং রঙিন প্রলেপযুক্ত ইস্পাত।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এসব পণ্যের কিছু বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। পরবর্তী সময়ে নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত রড উৎপাদনেও বড় বিনিয়োগ করে আবুল খায়ের গ্রুপ। ২০২৫ সালে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন রড উৎপাদন কারখানা যুক্ত হওয়ার পর আবুল খায়ের স্টিলের বার্ষিক ইস্পাত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ লাখ টনে পৌঁছায়।

বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পে ইস্পাতের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে এই খাতে বড় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা প্রতিষ্ঠানটির জন্য শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়, বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরির কৌশলও।

সিমেন্টেও শক্ত অবস্থান

আবুল খায়ের গ্রুপের আরেকটি পরিচিত ব্যবসা শাহ সিমেন্ট। ২০০২ সালে বাজারে আসে শাহ সিমেন্ট। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে। ২০১৮ সালে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বড় সম্প্রসারণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় আধুনিক উল্লম্ব রোলার মিল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। সিমেন্ট ব্যবসায় প্রবেশের মাধ্যমে আবুল খায়ের গ্রুপ নির্মাণশিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে।

ইস্পাত ও সিমেন্ট—দুটি খাতই বাংলাদেশের অবকাঠামো ও নির্মাণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

শুধু ইস্পাত ও সিমেন্ট নয়

আবুল খায়ের গ্রুপকে শুধু ইস্পাত বা সিমেন্টের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর ব্যবসার প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। প্রতিষ্ঠানটির ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় রয়েছে গুঁড়া দুধ, ঘন দুধ, চা, পানীয়, নাশতা, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও শিশুখাদ্য। মার্কস, স্টারশিপ ও সাইলন—এসব পরিচিত নামের পণ্যও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার অংশ।

অর্থাৎ একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পণ্য একদিকে বড় নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ পরিবারের প্রতিদিনের বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছে।

এ ধরনের ব্যবসা সম্প্রসারণের ফলে একটি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব হয়। কোনো একটি খাতে বাজার দুর্বল হলেও অন্য খাত থেকে ব্যবসা ধরে রাখার সুযোগ থাকে।

তবে এর জন্য প্রয়োজন বড় বিনিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা, বিপণন ও বিস্তৃত বিতরণ নেটওয়ার্ক।

সিরামিক ব্যবসায়ও বিস্তার

২০১১ সালে অধিগ্রহণের মাধ্যমে আবুল খায়ের গ্রুপ সিরামিক ও মার্বেল ব্যবসায় প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়। স্যানিটারি পণ্য ও সিরামিকের বাজারেও প্রতিষ্ঠানটির উপস্থিতি তৈরি হয়। এভাবে কয়েক দশকের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা একাধিক শিল্পখাতে ছড়িয়ে পড়ে।

এই ব্যবসায়িক যাত্রার মূল শিক্ষা কী?

আবুল খায়ের গ্রুপের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এক. ব্যবসার বৈচিত্র্য

একটি ব্যবসা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে নতুন নতুন শিল্পখাতে প্রবেশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

দুই. উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ

শুধু পণ্য আমদানি ও বেচাকেনার ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব কারখানা ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে।

তিন. নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি

ইস্পাত ও সিমেন্ট থেকে শুরু করে দুধ, চা, পানীয়, নাশতা ও সিরামিক—বিভিন্ন খাতে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করা হয়েছে।

চার. বিস্তৃত বিতরণব্যবস্থা

বাংলাদেশের বিশাল বাজারে পণ্য পৌঁছে দিতে উৎপাদনের পাশাপাশি শক্তিশালী বিতরণব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

পাঁচ. দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

ইস্পাত, সিমেন্ট ও সিরামিকের মতো শিল্পে কারখানা, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। ফলে এসব ব্যবসায় দ্রুত লাভের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বাজার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু একটি কোম্পানির গল্প নয়

আবুল খায়ের গ্রুপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—এর বড় একটি অংশ বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক ও ভোগ্যপণ্য—এসব খাতে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি দেশের শিল্পব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে কয়েক দশকে উৎপাদন, ব্র্যান্ড তৈরি এবং বহুমুখী ব্যবসা গড়ে তোলার এই যাত্রা তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের বেসরকারি শিল্পায়নের পরিবর্তনেরও একটি উদাহরণ।