আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স

এআই শপিং: সার্চ থেকে সুপারিশ—বদলে যাচ্ছে অনলাইন কেনাকাটা

AI Shopping-এর মাধ্যমে ই-কমার্সে পণ্য খোঁজা, তুলনা ও কেনাকাটার পরিবর্তন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে অনলাইন কেনাকাটা ও ই-কমার্সের ভোক্তা অভিজ্ঞতা।

পণ্য খোঁজা, তুলনা করা থেকে কেনার সিদ্ধান্ত—অনলাইন কেনাকাটার পরিচিত ধাপগুলোতে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআইভিত্তিক সুপারিশ ও স্বয়ংক্রিয় কেনাকাটা জনপ্রিয় হলে বদলে যেতে পারে ভোক্তা, ব্র্যান্ড ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সম্পর্ক।

একসময় অনলাইনে কোনো পণ্য কিনতে হলে প্রথমে সার্চ করতে হতো। এরপর একের পর এক ওয়েবসাইট ঘুরে পণ্যের দাম, বৈশিষ্ট্য ও গ্রাহকের মতামত দেখা, বিভিন্ন পণ্যের তুলনা করা এবং সবশেষে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ সেই প্রক্রিয়ায় নতুন একটি স্তর যোগ করছে।

এখন একজন ভোক্তা চাইলে সরাসরি এআইকে জিজ্ঞেস করতে পারেন—কোন ল্যাপটপ তার প্রয়োজনের জন্য ভালো, নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে কোন স্মার্টফোনটি বেশি সুবিধাজনক, কিংবা দুটি পণ্যের মধ্যে কোনটি কেনা উচিত।

অর্থাৎ শুধু তথ্য খোঁজা নয়, কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও এআইয়ের ভূমিকা বাড়ছে।

এই পরিবর্তনই তৈরি করছে নতুন একটি ধারণা—এআই শপিং।

কেনাকাটার অভ্যাসে নতুন পরিবর্তন

এনআইকিউ-এর ২০২৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৪২ শতাংশ ভোক্তা গত এক মাসে কেনাকাটার জন্য অন্তত একটি এআইভিত্তিক সরঞ্জাম ব্যবহার করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭ শতাংশ ভোক্তা পণ্যের সুপারিশ পেতে এআই ব্যবহার করেছেন। পাশাপাশি ১০ শতাংশ এআই-চালিত কেনাকাটার সহকারী এবং ৫ শতাংশ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট ব্যবহার করেছেন, যারা ব্যবহারকারীর হয়ে অর্ডার দেওয়ার মতো কাজ করতে পারে।

এর অর্থ এই নয় যে স্বয়ংক্রিয় এআই কেনাকাটা ইতোমধ্যে মূলধারায় পরিণত হয়েছে। বরং এটি দেখাচ্ছে, কেনাকাটার সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

এতদিনের প্রচলিত প্রক্রিয়াটি ছিল—

খোঁজা → তুলনা → সিদ্ধান্ত → কেনা

এআই শপিং সেই প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে নিয়ে যেতে পারে—

এআইকে জিজ্ঞাসা → সুপারিশ → তুলনা → কেনা

এই পরিবর্তনটি ছোট মনে হলেও এর ব্যবসায়িক প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।

সার্চের বদলে এআই সুপারিশ?

অনলাইন বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে গুগলসহ সার্চ ইঞ্জিন ছিল পণ্য খোঁজার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কোনো পণ্য কেনার আগে ভোক্তা সার্চ করতেন এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটের ফলাফল থেকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য বেছে নিতেন।

এআই এখানে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করছে।

একজন ভোক্তা যদি বলেন, “আমার বাজেট ৮০০ ডলার। কাজ ও গেমিং—দুই উদ্দেশ্যে একটি ভালো ল্যাপটপ চাই”, তাহলে এআই শুধু কয়েকটি ওয়েবসাইটের তালিকা না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পণ্য বাছাই করে দিতে পারে।

দাম, বৈশিষ্ট্য, গ্রাহকের মতামত এবং ব্যবহারকারীর প্রয়োজন—সবকিছু বিবেচনা করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও তৈরি করতে পারে।

ফলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু এমন নাও হতে পারে—

কোন ব্র্যান্ড গুগলে সবচেয়ে ওপরে আছে?

বরং প্রশ্ন হতে পারে—

কোন ব্র্যান্ডকে এআই ভোক্তার কাছে সুপারিশ করছে?

এআই হয়ে উঠছে নতুন কেনাকাটার সহকারী

হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউয়ের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও এআই এজেন্টের মাধ্যমে পণ্য খোঁজা, তুলনা করা এবং কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে।

এর পরবর্তী ধাপ হতে পারে আরও গুরুত্বপূর্ণ।

ধরা যাক, একজন ভোক্তার একটি নির্দিষ্ট পণ্য প্রয়োজন। তিনি শুধু এআইকে প্রয়োজন, বাজেট ও পছন্দের বিষয়গুলো জানালেন। এআই তখন বিভিন্ন বিকল্প খুঁজে তুলনা করল, সবচেয়ে উপযুক্ত কয়েকটি পণ্য নির্বাচন করল এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত ব্যবস্থায় অর্ডার দেওয়ার কাজও সম্পন্ন করতে পারল।

এ ধরনের ব্যবস্থাকেই বলা হচ্ছে এজেন্টনির্ভর বাণিজ্য

এখানে ভোক্তা নিজে প্রতিটি ধাপ পরিচালনা করছেন না। বরং এআই তার হয়ে কাজের একটি বড় অংশ সম্পন্ন করছে।

ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নতুন প্রতিযোগিতা

এআই শপিং জনপ্রিয় হলে ব্র্যান্ডগুলোর ডিজিটাল কৌশলেও পরিবর্তন আসতে পারে।

এতদিন ব্র্যান্ডগুলোর অন্যতম লক্ষ্য ছিল সার্চ ইঞ্জিনে ভালো অবস্থান তৈরি করা। সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন, বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন বাজারে দৃশ্যমানতা বাড়ানোর মাধ্যমে তারা ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে।

এআইনির্ভর কেনাকাটায় এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আরেকটি বিষয়—এআইয়ের কাছে দৃশ্যমানতা।

একটি ব্র্যান্ডের পণ্যের বিবরণ, দাম, বৈশিষ্ট্য, প্রাপ্যতা, গ্রাহকের মতামত এবং অন্যান্য তথ্য যদি সঠিক ও পরিষ্কারভাবে অনলাইনে না থাকে, তাহলে এআইয়ের পক্ষে সেই পণ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা তৈরি করা কঠিন হতে পারে।

তাই ভবিষ্যতের ব্র্যান্ড কৌশলে একটি নতুন প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—

“আমাদের পণ্য কি শুধু সার্চে পাওয়া যায়, নাকি এআইও সেটিকে বুঝতে ও সুপারিশ করতে পারে?”

ছোট ব্যবসার জন্যও সুযোগ

এআই শপিংয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো ছোট ব্যবসার সম্ভাবনা।

বড় ব্র্যান্ডের তুলনায় ছোট ব্যবসার বিজ্ঞাপন বাজেট কম হতে পারে। ফলে সার্চ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমানতা তৈরি করা তাদের জন্য কঠিন।

কিন্তু কোনো ছোট ব্যবসার পণ্য যদি ভালো হয়, দাম প্রতিযোগিতামূলক হয় এবং অনলাইনে পণ্যের তথ্য, ছবি, বৈশিষ্ট্য ও গ্রাহকের মতামত সঠিকভাবে উপস্থাপন করা থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের এআইভিত্তিক পণ্য অনুসন্ধানে সেই ব্যবসাও সুযোগ পেতে পারে।

অর্থাৎ এআই শপিং শুধু বড় কোম্পানির জন্য নতুন বাজার তৈরি করছে না; ছোট ব্যবসার জন্যও নতুনভাবে ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

এআই শপিং জনপ্রিয় হলে অনলাইন বাজারগুলোর জন্যও পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।

বর্তমানে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো ক্রেতাকে হাজারো পণ্য দেখায়। কিন্তু এআইভিত্তিক কেনাকাটায় ভোক্তা হয়তো এতগুলো পণ্য দেখতে চাইবেন না।

তিনি চাইতে পারেন—“আমার প্রয়োজন অনুযায়ী সেরা তিনটি পণ্য দেখাও।”

ফলে ই-কমার্সের প্রতিযোগিতা শুধু পণ্যের সংখ্যা বা ওয়েবসাইটের নকশায় সীমাবদ্ধ না থেকে তথ্যের মান, ব্যক্তিগতকরণ এবং এআইয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়েও হতে পারে।

বিজ্ঞাপন ব্যবসাতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা

এআই যদি পণ্য খোঁজা ও সুপারিশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে বিজ্ঞাপন ব্যবসাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

বর্তমানে ব্র্যান্ডগুলো সার্চ ইঞ্জিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন বাজারে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ভবিষ্যতে সেই প্রতিযোগিতার একটি অংশ হতে পারে এআইয়ের সুপারিশ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে।

তখন প্রশ্ন উঠবে—

কোন পণ্য কেন সুপারিশ করা হচ্ছে?

সুপারিশ কি পণ্যের মান ও ভোক্তার প্রয়োজনের ভিত্তিতে, নাকি বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রভাব রয়েছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, কারণ এআইয়ের সুপারিশ যদি ক্রেতার কেনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাহলে সেটি নিজেই একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বাসযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত তথ্যের প্রশ্ন

এআই শপিংয়ের সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে।

এআই সবসময় সঠিক তথ্য দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পণ্যের দাম পরিবর্তিত হতে পারে, কোনো পণ্য বাজারে নাও থাকতে পারে, আবার অনলাইনের কোনো পর্যালোচনাও ভুল বা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্যের প্রশ্ন।

এআই যদি একজন ভোক্তার পছন্দ, বাজেট, কেনাকাটার ইতিহাস ও আচরণ সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুপারিশ দিতে থাকে, তাহলে সেই তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হচ্ছে—তা নিয়েও প্রশ্ন থাকবে।

ফলে এআই শপিংয়ের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতার ওপর নয়, বিশ্বাস, স্বচ্ছতা ও তথ্যের নিরাপত্তার ওপরও নির্ভর করবে।

বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করে?

বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অনলাইন বাজার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা এবং অসংখ্য ছোট উদ্যোক্তা এখন ডিজিটাল মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছেন।

এআই শপিং বিশ্বব্যাপী আরও জনপ্রিয় হলে বাংলাদেশের ব্যবসাগুলোর সামনেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পণ্যের সঠিক তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পণ্যের নাম, বিবরণ, বৈশিষ্ট্য, দাম, প্রাপ্যতা, ছবি এবং গ্রাহকের মতামত—সবকিছু যত পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা যাবে, ভবিষ্যতের এআইভিত্তিক অনুসন্ধানে সেই পণ্যকে বোঝা তত সহজ হতে পারে।

বাংলাদেশের ছোট ব্যবসার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন হতে পারে।

কারণ ভবিষ্যতে ক্রেতা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট দোকানের নাম না জেনেই এআইকে বলবেন—

“বাংলাদেশে এই বাজেটের মধ্যে ভালো একটি পণ্য খুঁজে দাও।”

সেখানে কোন স্থানীয় ব্র্যান্ডের নাম উঠে আসবে, সেটিই হতে পারে নতুন প্রতিযোগিতার জায়গা।

বড় পরিবর্তনটি আসলে কোথায়?

এআই শপিংয়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো অনলাইন দোকানের চেহারা বদলে যাওয়া নয়।

বড় পরিবর্তন হতে পারে কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায়।

একসময় সার্চ ইঞ্জিন মানুষকে তথ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।

অনলাইন বাজার পণ্য খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্র্যান্ডকে মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে।

এআই এখন এই প্রক্রিয়াগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভোক্তাকে বলতে পারে—কী প্রয়োজন, কোন পণ্যগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে এবং কোনটি তার জন্য বেশি উপযোগী।

আজ মানুষ এআইকে প্রশ্ন করছে।

আগামী দিনে হয়তো প্রশ্নটি হবে আরও সরাসরি—

“আমার জন্য সবচেয়ে ভালো পণ্যটি খুঁজে দাও।”

আর তখন ই-কমার্সের প্রতিযোগিতা শুধু কে ভালো পণ্য বিক্রি করে, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না।

প্রশ্ন হবে—

এআই যখন ভোক্তার হয়ে পণ্য খুঁজবে, তখন কোন ব্র্যান্ডকে সে খুঁজে পাবে এবং কোন ব্র্যান্ডকে সুপারিশ করবে?

সেখানেই শুরু হতে পারে ই-কমার্সের পরবর্তী অধ্যায়।


বিটাইমস বিশ্লেষণ | ট্রেন্ডস

সূত্র: এনআইকিউ (NIQ), হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ

বিটাইমস বিশ্লেষণ