ফ্যাক্টরি ভিজিট

গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি, শিল্প উৎপাদনে বাড়ছে চাপ

বিটাইমস বিজনেস | ৬ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি আবারও উৎপাদন কার্যক্রমে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোতে কম গ্যাসচাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নের ওপর।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এই সংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় জেলার ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং দেশের রপ্তানি সক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

সূচকতথ্য
গাজীপুরে দৈনিক গ্যাসের চাহিদাপ্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট
দৈনিক গ্যাস সরবরাহপ্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট
আনুমানিক ঘাটতিপ্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট
সরবরাহ ঘাটতিপ্রায় ৪৫ শতাংশ
বিজিএমইএর হিসাবে উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস (এপ্রিল ২০২৬)২৫–৩০ শতাংশ

গাজীপুরে উৎপাদন ব্যাহত

আগস্ট ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। গ্যাস–সংকট, অর্ডার স্বল্পতা এবং সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে জেলার প্রায় ২০ শতাংশ কারখানা তিন থেকে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করে। তবে তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অধিকাংশ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; অনেক কারখানা সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে গেছে।

গাজীপুরে তিতাস গ্যাসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় দৈনিক প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছিল প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়। স্বল্পচাপের কারণে কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ও টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে।

উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ

গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, অব্যাহত গ্যাস–সংকটের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, ক্রেতারা যদি বাংলাদেশের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে অনিশ্চিত মনে করেন, তাহলে তারা বিকল্প উৎপাদন গন্তব্য বেছে নিতে পারেন।

পিএন কম্পোজিটের ব্যবস্থাপক তাপস পালের ভাষ্য, গ্যাস–সংকট দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে উঠবে। এতে ভবিষ্যতে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

গ্যাসের চাপ কমে গেলে কারখানার বয়লার ও স্টিম সিস্টেম পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যায় না। ফলে ডাইং, ফিনিশিং, ওয়াশিংসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়। উৎপাদন সময়সূচি পরিবর্তন, অতিরিক্ত শিফট এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।

উৎপাদন সক্ষমতায় প্রভাব

জ্বালানি সংকটের প্রভাব নিয়ে বিজিএমইএ এর আগে জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। বিশেষ করে গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি ছিল।

তবে এই পরিসংখ্যানটি এপ্রিল মাসের পরিস্থিতির ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল। আগস্টের পরিস্থিতিতে উৎপাদন সক্ষমতার ওপর প্রভাব কারখানাভেদে ভিন্ন হতে পারে।

সংকটের কারণ

২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি ভাসমান এলএনজি (FSRU) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক গ্রাহক—সব খাতেই সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

জ্বালানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, টার্মিনালের মেরামতকাজ শেষ হলে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে বিলম্ব হলে উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল, কাচ ও কেমিক্যাল শিল্পের বড় অংশই প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর।

সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তৈরি পোশাক শিল্পে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের শরৎ ও শীতকালীন (Fall/Winter) মৌসুমের অর্ডারের উৎপাদন, ফিনিশিং এবং চালান প্রস্তুতের ব্যস্ততা থাকে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এসব অর্ডারের উল্লেখযোগ্য অংশ রপ্তানি করা হয়।

এই সময়ে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে উৎপাদনের গতি কমে যায়, ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি, জেনারেটর বা অতিরিক্ত শিফটের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

এরপর কী?

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পমেয়াদে এলএনজি টার্মিনালের মেরামত দ্রুত শেষ করে সরবরাহ বাড়ানো, শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন খাতকে সহায়তা করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য এবং শিল্প খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Btimes Explained

গ্যাসের চাপ কমলে কারখানায় কী হয়?

  • বয়লার ও স্টিম সিস্টেম পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যায় না।
  • ডাইং, ফিনিশিং ও ওয়াশিং প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
  • উৎপাদনের গতি কমে যায়।
  • বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
  • সময়মতো রপ্তানি চালান প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
  • ছোট ও সাবকন্ট্রাক্টিং কারখানাগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিটাইমস ইনসাইট

গাজীপুরের গ্যাস–সংকট একটি জেলার সমস্যা হলেও এর তাৎপর্য জাতীয়। কারণ, বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানির বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকে না; রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা, কর্মসংস্থান, নতুন বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতার ওপরও পড়ে।

গ্যাস সরবরাহের এই পরিস্থিতি তাই শুধু একটি জ্বালানি ইস্যু নয়; এটি দেশের শিল্প প্রতিযোগিতা, রপ্তানি সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই সাময়িক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।